You are here
Home > বাংলাদেশ > বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর মরহুম গোলাম কিবরিয়ার ৪৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর মরহুম গোলাম কিবরিয়ার ৪৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Share

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, খোকসা কুমারখালীর সাবেক সংসদ সদস্য শহীদ গোলাম কিবরিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর কুমারখালী বড় মসজিদ ঈদগাঁ মাঠে ঈদের নামাজরত অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন তিনি।

ব্যক্তিজীবনে তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন ও আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তিনি খোকসা কুমারখালী থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন।

বিশেষ করে স্বাধীনতার ইতিহাসে খোকসা কুমারখালীর রাজনীতির প্রাণপুরুষ ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গোলাম কিবরিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরের ইতিহাস হয়ে রয়েছে।

১৯১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার বাটিকামারা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন শহীদ গোলাম কিবরিয়া। পিতার নাম ফকর উদ্দীন মুন্সী, মাতা কুনু বিবি। কুমারখালী দাখিল মাদরাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেন। ১৯৩৬ সালে কুমারখালীর ঐতিহ্যবাহী এমএন হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে উচ্চমাধ্যমিক ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। ১৯৩৮ সালে ইংরেজিতে গোল্ড মেডেলসহ কৃত্তিত্বের সহিত উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে পড়াশোনা অবস্থায়ই গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিতে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। মূলত তারই হাত ধরেই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন গোলাম কিবরিয়া।

জানা যায়, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পর তখন ভারতীয় উপমহাদেশ তখন ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হওয়ার রাজনীতিতে উদ্দীপ্ত। নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র, রাজনীতি আর নেতৃত্ব নিয়ে তখন রাজনীতির মাঠে নতুন মেরুকরণ। এইসময়ই তরুণ গোলাম কিবরিয়া হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পূর্বে তিনি কোলকাতার শিয়ালদহ রেলওয়েতে স্টেশন মাস্টার হিসেবে চাকুরি পেয়েছিলেন। চাকুরত অবস্থায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে মতনৈকট্য দেখা দিলে তিনি চাকুরি ছেড়ে চলে আসেন নিজ এলাকায়। পুরোদমে রাজনীতে প্রবেশ করেন।

গোলাম কিবরিয়ার প্রয়াত সহধর্মিনী নূরজাহান বেগম এক স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছিলেন,‘কুমারখালী রেলওয়ে স্টেশনের দক্ষিণ আম গাছের নিচে বেশ কিছু অসহায় পরিবার এলোমেলো ভাবে বসে আছেন। সালটা ১৯৪৭ দেশ বিভাগের পর নিজস্ব বাড়ি ঘর ছেড়ে রেখে নিরুপায় হয়ে ওপার বাংলায় চলে আসা মানুষগুলোকে নজরে পরলো তার। অকল্পনীয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে তিনি এক এক করে তাদের আশ্রয় দিলেন কুন্ডুপাড়া ও এলঙ্গী পাড়াতে।’
গোলাম কিবরিয়া বয়সে বঙ্গবন্ধুর বড় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু সবসময় গোলাম কিবরিয়াকে মিয়া ভাই বলে সম্বোধন করতেন। বঙ্গবন্ধু ও গোলাম কিবরিয়া দুজনারই রাজনৈতিক গুরু ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওর্য়াদী। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ও পরে গোলাম কিবরিয়ার আর ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম একই সঙ্গে রাজনীতি করতেন। তাদের মধ্যে ছিলো সুসম্পর্ক।

২০২০ সালের ১৫ আগস্ট ‘মুক্তদেশ’ থেকে প্রকাশিত লেখক ও গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ গিয়াস উদ্দীন আহমেদ মিন্টু তার রচিত ‘বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থের ৫৯ পৃষ্ঠায় গোলাম কিবরিয়ার বিষয়ে উল্লেখ করেছেন,

‘৬৭’র গোড়ার দিকে এবং বঙ্গবন্ধু গ্রেফতারের পূর্বের সময়টাতে তিনি কুষ্টিয়া এসেছিলেন। কর্মীসভা হয়েছিলো ‘মোহনী মোহন বিদ্যাপীঠ স্কুল’ সংলগ্ন অডিটোরিয়ামে। খুব সম্ভবত ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন কাজী কফিল উদ্দিন মোক্তার)। শহীদ গোলাম কিবরিয়া ঐ কর্মীসভায় ‘ছয়দফা’র পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থণ জানিয়েছিলেন।’ ৭২ পৃষ্ঠায় গোলাম কিবরিয়ার রাজনৈতিক বিষয়ে উল্লেখ করেছেন, ৭০-এ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু ১ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া আসেন। সাথে ছিলেন জাতীয় চার নেতা। তিনি ভেড়ামারা মিরপুর আমলা খলিসাকুন্ডি, গাংনী, মেহেরপুর পথাসভা শেষে সন্ধ্যার পরপর কুষ্টিয়া ডাকবাংলোতে বিশ্রাম করেন। পরে তিনি রাত্রি ৭-৮ টার দিকে পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে’র গণজমায়েতে বক্তৃতা করেন। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান আক্কাস। ঐ সভায় শহীদ গোলাম কিবরিয়া এক বিশাল কর্মীবাহিনী নিয়ে জমায়েতে এলে বঙ্গবন্ধু তাঁকে সাদরে আলিঙ্গন করেন এবং এক পর্যায়ে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ও শহীদ গোলাম কিবরিয়াকে যথাক্রমে জাতীয় পরিষদ সদস্য পদপ্রার্থী ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।’

১৯৬৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুমারখালীর স্থানীয় আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে কুষ্টিয়ার প্রথম শহীদ নির্মাণ করা হয় কুমারখালী জেএন হাইস্কুল মাঠে। এই শহীদ মিনার নির্মানের অন্যতম রুপকার ছিলেন গোলাম কিবরিয়া। শহীদ মিনার তৈরির তিনদিন পরে ২১ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এই শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে উদ্বোধন করেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু জীবদ্ধশায় ১৯৬৬ সালের আগে ও পরে দুইবার এসেছেনে কুমারখালী এই গোলাম কিবরিয়ার বাড়িতে। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে খোকসা কুমারখালী আসন থেকে আওয়ামী লীগরে মনোনয়নে নিবার্চনে প্রাথী হন গোলাম কিবরিয়া। নির্বাচনে গোলাম কিবরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সৈয়দ আহমেদ পেয়েছিলেন ৬ হাজার ২৩৭ ভোট। অন্যদিকে গোলাম কিবরিয়া ৬১ হাজার ৪০৭ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন।

স্বাধিকার আন্দোলন থেকেই গোলাম কিবরিয়া কুষ্টিয়া জেলায় নিজের গ্রহণ যোগ্যতা তৈরি করেছিলেন তার রাজনৈতিক গুণাবলি দিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের সাথেও ছিলো কুমারখালীর কিবরিয়া পরিবারের অত্যন্ত সখ্য। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ডাঁশা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধকালীন গেরিলা কমান্ডার মো. লুৎফর রহমান মাস্টার সাক্ষাৎকালে জানান, ‘বঙ্গবন্ধু যখন ছয়দফা দাবি পেশ করেন তখন গোলাম কিবরিয়ার নেতৃত্বে কুষ্টিয়া, খোকসা কুমারখালীতে এই ছয়দাফর পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আমার দীর্ঘ জীবনে গোলাম কিবরিয়া ছিলেন আমার অভিভাবক। একাত্তর সালে ভারতে গেলে থাকা, খাওয়া ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছেন। পরবর্তীতে যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য আমার বাহিনীকে অস্ত্রও দিয়েছেন।

দেশ স্বাধীনের পরে তিনিই আমাকে নিয়ে ঢাকার ধানমন্ডির বাড়িতে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবার জন্য। ১৯৭৪ সালে গোলাম কিবরিয়াকে ঈদের নামাজে প্রকাশ্যে হত্যা করার মধ্য দিয়ে খোকসা কুমারখালী থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করা হয়েছে। আর ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বপ্ন ও চেতনাকে ধ্বংশ করা হয়েছে। তার ছেলে সাবেক এমপি মরহুম আবুল হোসেন তরুণের সাথে ছিলো আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক।’

মুক্তিযুদ্ধের এই সংগঠক গোলাম কিবরিয়া ছিলেন কুমারখালী আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি খোকসা কুমারখালী থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কুষ্টিয়া, কুমারখালী ও খোকসার রাজনীতিতে গোলাম কিবরিয়া পরিবারের একটি এতিহ্যবাহী সুনাম রয়েছে। কারণ রাজনীতিরি মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের নেতা।

রাজনৈতিক কারনে বঙ্গবন্ধু ছাড়াও জাতীয় চার নেতার সাথেও ছিলো তার পারিবারিক সুসম্পর্ক। কিন্তু ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর কুমারখালীর বড় জামে মসজিদ ঈদগাঁ মাঠে ঈদের জামাতে নামাজরত অবস্থায় চরমপন্থিদের গুলিতে তিনি নিহত হন। পরবর্তী সময়কালে তার সুযোগ্য সন্তান আবুল হোসেন তরুণ এই আসন থেকে ১৯৭৫ এবং ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিও প্রয়াত হলে আবুল হোসেন তরুণের সহধর্মিনী ও শহীদ গোলাম কিবরিয়ার পুত্রবধু বেগম সুলতানা তরুণও ২০০৮ সালে সংসদ্য সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে গোলাম কিবরিয়ার পৌত্র ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ খোকসা কুমারখালী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। গোলামি কিবরিয়ার আরেক ছেলে শামসুজ্জামান অরুণ বর্তমানে কুমারখালী পৌরসভার মেয়র।

Top