চাকুরির আশায় কিডনি হারায় গোবিন্দগঞ্জের ওয়াহাব

আব্দুর রহিম বাদশা, গাইবান্ধা প্রতিনিধি
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  11:23 PM, 16 November 2020

Share

কিডনি দেহের অন্যান্য অঙ্গের মতো একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কিডনির কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, যা স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিডনি উচ্চ রক্তচাপ ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা করে। শরীরের যত দূষিত পদার্থ রয়েছে সেগুলো যেন শরীরে জমা হয়ে থাকতে না পারে, প্রস্রাবের সঙ্গে যেন বেরিয়ে যায় সেটি কিডনি করে। এ ছাড়া শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য এবং তরলের ভারসাম্য কিডনির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। কিডনি থেকে কিছু হরমোন বের হয়। যেমন : ভিটামিন ডি থ্রি। এর কারণে হাড়গুলো বড় হয়, অস্থি মজ্জা শক্তিশালী হয়।

এছাড়া কিডনি থেকে বের হওয়া ইরাথ্রোপ্রোটিন রক্তে লোহিত কণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। এটি নির্গত হতে না পারলে মানুষ রক্তশূন্যতায় ভোগে।সর্বপরি বলা চলে মানুষের শরীরে কিডনি নামক অঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তবে চাকুরীর প্রলোভন ও ভয় ভিতী দেখিয়ে গোবিন্দগঞ্জের আব্দুল ওহাব নামে এক যুবকের শরীর থেকে কিডনি নামক এ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি বের করে নিয়েছে কিডনি পাচারকারী এক প্রতারক চক্র।

আজ সোমবার(১৬ -নভেম্বর) পিবিআই গাইবান্ধার পলাশপাড়াস্থ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গাইবান্ধার পিবিআই এর পুলিশ সুপার এ আর এম আলিফ জানান- গত ২০১৮ সালের ২২ নভেম্বর চাকরী দেওয়ার কথা বলে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ছোটা সোহাগী গ্রামের আব্দুল ওয়াহাবকে ওষুধ কোম্পানীতে চাকরী দেওয়ার কথা বলে পূর্ব পরিচয় সুত্রে গাজীপুর থেকে ডেকে নেয় পার্শ্ববর্তী পশ্চিম বানিহালী গ্রামের রাকিবুল হাসান। এরপর থেকে ওয়াহাবের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় ওয়াহাবের বাবা আব্দুল মজিদ সরকার ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর গোবন্দিগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই বছরের ২২ নভেম্বর রাকিবুল গাজিপুর পুলিশের হাত ধরা পড়লে ওয়াহাবকে কিডনী পাচার চক্রের হাতে তুলে দেওয়ার তথ্য দেয়। পরে পিবিআই ওই মামলার তদন্তভার নেয়ার পর কিডনি পাচার চক্রের সদস্য রায়হানের সম্পৃক্ততা পায়। অনুসন্ধানের পর অভিযান চালিয়ে গত শুক্রবার ঢাকার বাড্ডা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃত রায়হান গত রোববার গাইবান্ধার অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নজরুল ইসলামের আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেয়। সেখানে জানানো হয়, ওয়াহাবকে ডেকে নেওয়ার পর রাকিবুল তাকে রায়হানের নিকট হস্তান্তর করেন।তখন রায়হান অপর এক ব্যাক্তির সহযোগিতায় ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে ওয়াহাবের মেডিকেল পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তাকে ভারতে পাঠায়। সেখানে একটি দালাল চক্র দীঘর্দিন তাকে আটকে রাখার পর সেখানকার একটি হাসপাতালে অপারেশনের মাধ্যমে ওয়াহাবের বাম পাশের কিডনি বের করে নেওয়া হয়। পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার আরও জানান, এ পর্যন্ত রাকিবুল ৪০ ব্যক্তির কিডনি কেনাবেচা করেছে বলে জানিয়েছে। তার তথ্যের ভিত্তিতে অন্য অপরাধীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে কিডনি হারানো আব্দুল ওয়াহাবের সাথে কথা হলে তিনি জানান আমাকে ঔষধ কোম্পানিতে চাকুরী দেওয়ার কথা বলে চক্রটি চাকুরীর ট্রেনিং করানোর জন্য ভারতে নিয়ে যায়। নিয়ে গিয়ে সেখানে আমাকে অন্য এক চক্রের হাতে তুলে দেয়।তারা বলে তোমার একটা কিডনি ৩০লাখ টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি এখন যদি তুমি সেচ্ছায় কিডনি না দাও তাহলে মেরে কেটে তোমার কিডনি বের করে নিয়ে তোমাকে ট্যাংকে ভরানো হবে। তখন আমি বাধ্য হয়ে কিডনি দিয়ে আসি।এখন আমি এক কিডনি হারিয়ে অপর এক কিডনিতে ভর করে বেঁচে আছি।আমাকে নিয়মিত ঔষধ খেতে হয় এবং দুচারদিন পর পরই শরীরে ইনজেকশন দিতে হয়।তিনি আরও বলেন আমি ১০/১৫ কেজি ওজনের বোঝাও বহণ করতে পারিনা।আমার শরীরে মাঝে মধ্যেই রক্ত শূন্যতা দেখা দেয়। কিডনি হারিয়ে কাজ কর্ম করতে না পারায় আব্দুল ওয়াহাব পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে গোবিন্দগঞ্জে কিডনি পাচার চক্রের সদস্যরা সক্রিয়। তারা গোবিন্দগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন সময়ে নিরীহ লোকদের নানা প্রলোভন দিয়ে ফুসলিয়ে ঢাকা ও কলকাতা নিয়ে গিয়ে কিডনিসহ শরীরে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অপসারণ করে তা বিক্রির করে আসছে।এর পরিপ্রেক্ষিতে এলাকাবাসী বেশ কয়েকবার সোচ্চার হতেও দেখা যায়।বিভিন্ন সময় প্রতিকার পেতে মানববন্ধন করে এলাকাবাসী।

আপনার মতামত লিখুন :