You are here
Home > বাংলাদেশ > জীবন বাঁচানো ‘ঢোপকল’ এখন রাজশাহীর বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য।

জীবন বাঁচানো ‘ঢোপকল’ এখন রাজশাহীর বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য।

Share

বাংলাদেশের শহরগুলোর মাঝে রাজশাহী নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রম নাম। এর শান্ত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ যে কাউকে মুগ্ধ করবে। নির্মল ও শান্ত পরিবেশ উত্তরের এই শহরটিকে এনে দিয়েছে দেশজোড়া খ্যাতি।

প্রতিটি শহরেরই একটা অতীত ইতিহাস থাকে। থাকে কিছু ঐতিহ্য। এগুলো নিয়ে শহরের নাগরিকদের থাকে গর্ব। রাজশাহীও এর ব্যতিক্রম নয়। রাজশাহীর আছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। আধুনিক মহানগরীর ভাঁজে ভাঁজে এখনও দেখা যায় সেসব ঐতিহ্যের কিছু কিছু নিদর্শন। এমনই এক ঐতিহাসিক নিদর্শন হলো রাজশাহীর ঢোপকল। আজকের লেখা সেই ঢোপকল নিয়েই।

রাজশাহীতে প্রাচীন যুগ থেকেই গড়ে উঠেছিল জনবসতি। ধীরে ধীরে এখানে নগর প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে রাজশাহী পরিণত হয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিভাগে।

১৮৭৬ সালে ব্রিটিশরা রাজশাহী মিউনিসিপালিটি বা রাজশাহী পৌরসভা প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিটি নগরেই নাগরিক সুবিধার সাথে সাথে থাকে বিভিন্ন সমস্যা। রাজশাহীও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এখানকার প্রধান সমস্যা ছিলো সুপেয় পানির সমস্যা। বরেন্দ্রভূমি এলাকায় এই সমস্যা খুবই সাধারণ। রাজশাহীর পানীয় জলের প্রধান উৎস ছিলো মূলত নগরীর পাশ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মা নদী আর নগরীর ভেতরে থাকা পুকুর ও দিঘীগুলো। এছাড়াও অবস্থাসম্পন্ন বাড়িগুলোতে ছিলো ইঁদারা, কুয়া ও নলকূপ। তবে সাধারণ মানুষকে পানির জন্য মূলত নির্ভর করা লাগতো নদী ও পুকুরগুলোর ওপরই। বারোয়ারী ব্যবহারে পুকুরগুলোর পানি অনেক সময়ই দূষিত হয়ে পড়ত। ফলে প্রায় প্রতি বছরই নগরবাসীদের ভুগতে হতো ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরাসহ নানা পানিবাহিত রোগে। এসব রোগে প্রতিবছর অনেকের মৃত্যুও ঘটতো।

১৯৩৪ সালে রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন রায় ডি. এন. দাশগুপ্ত। তিনি দায়িত্ব লাভের পর রাজশাহীবাসীর এই দুর্দশা লাঘবের পদক্ষেপ নিলেন। তার নেতৃত্বে পৌরসভা সিদ্ধান্ত নেয় যে, রাজশাহীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে স্থাপন করা হবে সুপেয় পানি সরবরাহের কল। মিনিস্ট্রি অব ক্যালকাটার অধীনে পৌরসভার উদ্যোগ ও পরিচালনায় নগরীতে প্রথমবারের মতো স্থাপিত হবে ‘রাজশাহী ওয়াটার ওয়ার্কস’ নামে পানি শোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থা।

পৌরসভার এই মহতী উদ্যোগে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলো জনকল্যাণমূলক সংগঠন রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন। রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন কেবল নিজেরাই এগিয়ে এলো না, তারা শহরের ধনী ব্যক্তিদের প্রতিও আহবান জানাল সহায়তার জন্য। তারাও সাড়া দিলেন। সবচেয়ে বেশি এগিয়ে এলেন তৎকালীন পুঠিয়ার মহারানী হেমন্তকুমারী। তিনি একাই দান করলেন ৬৫ হাজার টাকা।

নগরীর হেতম খাঁ এলাকায় রাজশাহী জেলা বোর্ডের দান করা জমিতে নির্মাণ করা হলো পানি শোধনাগার। এতে ব্যয় হয় ২,৫৩,২৮৫ টাকা। মহারানী হেমন্তকুমারীর বিরাট অঙ্কের একক দানের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরুপ এর নাম ‘রাজশাহী ওয়াটার ওয়ার্কস’ এর বদলে দেয়া হলো ‘মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস’। ১৯৩৭ সালের ১৪ আগস্ট যাত্রা শুরু করলো মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস।

মোড়ে মোড়ে স্থাপিত হলো পানির কল। নগরবাসী এই ধরনের পানির কল আগে দেখেনি। তাদের কাছে এটি পরিচিত হয়ে উঠলো ‘মহারানীর ঢোপকল’ বা ‘হেমন্তকুমারীর ঢোপকল’ বা শুধু ‘ঢোপকল’ নামে। পরবর্তী দিনগুলোতে এই ঢোপকলগুলোই পরিণত হলো নগরীর বিশুদ্ধ পানির প্রধান উৎসে।

মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কসের অধীনে নগরীর মোড়ে মোড়ে নির্মিত হয় শতাধিক ঢোপকল। এগুলো একাধারে ছিলো রিজার্ভার এবং কল। প্রতিটি ঢোপকল এর উচ্চতা ভূমি থেকে ১২ ফুট এবং ব্যাস ৪ ফুট। প্রতিটি ঢোপকল ৪৭০ গ্যালন পানি ধারণ করতে পারতো। নিচের দিকে থাকতো একটি ট্যাপ যা দিয়ে পানি সংগ্রহ করা হতো। সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে একেকটি ঢোপকল তৈরি হতো। টিনের সাহায্যে ঢেউ খেলানো নকশা করা হতো এতে। অত্যন্ত মজবুত করে তৈরি করা হতো একেকটি ঢোপকল।

প্রতিটি ঢোপকল ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইনের মাধ্যমে যুক্ত ছিলো নগরীর হেতম খাঁ-তে অবস্থিত পানি শোধন কেন্দ্রের সাথে। পাইপগুলো ছিলো কাস্ট আয়রনের আর অন্যান্য ফিটিংসগুলো ছিলো পিতলের তৈরি। কেবলমাত্র সিমেন্টের ঢোপকল বাদ দিয়ে বাকি সব জিনিসপত্রই ইংল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিলো।

হেতম খাঁয় অবস্থিত মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কসের দৈনিক ৭০০ ঘন মিটার ভূগর্ভস্থ পানি শোধন করার ক্ষমতা ছিল। এখানে ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষরতা ও পানিতে থাকা আয়রন পরিশোধন ও জীবাণুমুক্ত করে পাঠানো হত ঢোপকলগুলোতে। পানি শোধনাগার থেকে প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে পানি সরবরাহ করা হত। সেই পানি জমা থাকতো ঢোপকলগুলোতে। ফলে ঢোপকলগুলো থেকে সারাদিনই পানি পাওয়া যেত। প্রতিটি ঢোপকলে বালি ও পাথর এর স্তর দিয়ে তৈরি রাফিং ফিল্টার ছিলো। ফলে পরিশ্রুত পানি আরো পরিশ্রুত হয়ে বের হত। এছাড়া গরমের সময় ঠান্ডা পানিও পাওয়া যেত।

প্রতিটি ঢোপকল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হত। প্রতিটি ঢোপকলের ওপরে থাকতো ঢাকনা। এটি দিয়ে ভেতরে মানুষ প্রবেশ করতে পারতো। প্রতি দুই মাস অন্তর পৌরসভার কর্মীরা এর ভেতরে ঢুকে জীবানুনাশক ও অন্যান্য পরিষ্কারক দিয়ে ঢোপকলগুলো আগা-গোড়া ধুয়ে পরিষ্কার করতো। এছাড়াও প্রতি দুই মাস অন্তর অন্তর শহরের প্রতিটি ঢোপকল থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হতো ল্যাবে। পানির গুণগত মান যেন বজায় থাকে তা নিশ্চিত করা হতো। এককথায়, সেই সময়ে রাজশাহী নগরবাসী পেয়েছিলো অসাধারণ এবং নিরাপদ এক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা।

কোনো ব্যবস্থাই চিরদিন মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না। ঢোপকলের মাধ্যমে এই পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও পারেনি। সময়ের সাথে সাথে রাজশাহীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাড়তে থাকে নগরীর আকার। একসময়ের পানির প্রধান উৎস ঢোপকলগুলো আর নগরবাসীর চাহিদা পূরণ করতে পারছিল না। প্রয়োজন হয় নতুন প্রযুক্তির।

১৯৬১ সালে নতুন নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে নগরীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়। সারা শহরে বেশ কয়েকটি বিরাটাকারের ওভার হেড পানির ট্যাঙ্ক তৈরি করা হয়। নগরে গড়ে ওঠে সমান্তরাল আরেকটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা।

 

 

Top