সুশীল সমাজ বিনির্মানে শিক্ষক।

সোহেল রানা, জয়পুরহাট প্রতিনিধি
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  11:19 PM, 05 October 2020

Spread the love

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। জ্ঞান অন্ধকার-কুসংস্কার দুর করে শুদ্ধাচার, আচার, শৃংখলাবোধ, নৈতিকতা আনয়ন করে বলেই জ্ঞানই শক্তি। জ্ঞানে বড় জাতি, মনে বড় হয়। মনে বড় জাতি ধনে-ঐশর্য্যে বড় হয়। তাই জ্ঞান আহরণ করে সে মতে চলা এবং চার পাশের জগৎ ও জীবন কে জানার তাগিদ আবহমান কাল থেকে। আর এ জ্ঞান আহরণ ও বিতরণকারী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। এ কারণেই শিক্ষক কে বলা হয় জাতির অভিভাবক। সুশীল সমাজ গঠনে অবদান রাখতে পারে একজন আদর্শ শিক্ষক। সংকীর্ণতা, স্বজনপ্রীতি, তোষামোদী, সত্যকে আড়াল করা থেকে বিরত থেকে, মুক্ত, উদার, বুদ্ধি ভিত্তিক, অসাস্প্রদায়িক বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা বোধ সম্পন্ন শিক্ষক দ্বারা গড়ে উঠে সুনির্মল পৃথিবী, উন্নত সমৃদ্ধ মানবিক গুণ সম্পন্ন ন্যায় ভিত্তিক সমাজ।

শিশুর মনমানসিকতা, চিন্তা চেতনা, আদর্শ সবকিছুই আবর্তিত, বিবর্তিত, নিয়ন্ত্রিত হয় শিক্ষকের দ্বারা। কাঁদা-মাটির মত শিশু গড়ে উঠে শিক্ষকের চিন্তা চেতনা ও মনমানসিকতার আদলে। পিতা-মাতা জন্ম দিলেও চিন্তা-চেতনা ও চরিত্র গঠনে শিক্ষককে অনুকরণ অনুসরণ করে অবলীলা ক্রমে। কোমল মতি শিশু মনের অজান্তে শিক্ষকের দ্বারা প্রভান্বিত হয়। শিক্ষকের কথা, অগাধ বিশ্বাস করে নিঃসংকোচে নির্দ্বিধায়। তাই সমাজ বদলাতে হলে, উন্নত, সমৃদ্ধ দারিদ্রমুক্ত, ন্যায় ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে সর্বাগে, দায়িত্ব নিতে হবে শিক্ষককেই। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষ করে রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১ সালের ভিশন-মিশন বাস্তবায়নে নেতৃত্ব তৈরীতে এককথায় বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বমানের মত যোগ্য, দক্ষ, অসাম্প্রদায়িক মুক্ত চিন্তা, বুদ্ধি ভিত্তিক প্রগতিশীল মানব সম্পদে সৃষ্টিতে শিক্ষককেই এ গুণাবলী অর্জন করতে হবে। জাতিকে দিতে হবে নেতৃত্ব।

সুশীল সমাজ গঠনে বিশেষ করে ধর্মান্ধতা, সংকীর্ণতা, দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা, অনুরাগ-বিরাগ, পরমত সহিষ্ণুতা সব কিছুই নির্ভর করে আহরিত জ্ঞানের উপর। এ মূখ্য, প্রধান নিয়ামক শিক্ষক। শিক্ষক পারে সমাজরাষ্ট্র, রুচিবোধ বদলাতে, প্রাচীন কালে সক্রেটিস, প্লেটো, এরিষ্টটল, আধুনিক কালে সিঙ্গাপুর, জাপান উন্নতির যে সোপান তৈরী হয়েছে তার পিছনে আছে অদম্যচেষ্টা, পথনির্দেশনা কিছু ব্যক্তির নেতৃত্ব এবং তাঁদের ভিশন আশার আলো দেখিয়ে এ পর্যায়ে নিয়ে আশা। তাই শিক্ষককেই বদলাতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে আত্মশুদ্ধি করতে হবে। আত্ম সমালোচনা, নিজের ঘাটতি উপলব্ধি করে তা অর্জনে সচেষ্ট থাকতে হবে সর্বদা। অভিজ্ঞতাকে শাণিত করে নতুন নতুন তথ্য গ্রহণপূর্বক সমৃদ্ধ হতে হবে নিজেদেরকে। বর্তমান প্রজন্ম পাঠাগারে পাঠ্যাভাস ছেড়ে যে ভাবে যন্ত্র নির্ভর (ফেসবুক/ডিভাইস) শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়েছে তাতে ভাল বিষয়ের পরিবর্তে নৈতিবাচক বিষয় গুলির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বিপদগামী হচ্ছে যা আমাদের জন্য অশনি সংকেত।

আত্ম প্রত্যয়ী, মর্যাদাপূর্ণ, উন্নত, সমৃদ্ধ, দেশপ্রেম, ত্যাগী মানবতা বোধ সম্পন্ন যোগ্য নাগরিকের স্বপ্ন দেখতে হবে অর্থাৎ শিক্ষার্থীর শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগিক বিকাশ সাধন করা এবং তাদের দেশাত্ম বোধ বিজ্ঞান মনস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে শিক্ষককে। এ মাটি ও মানুষের প্রতি জবাবদিহিতা দায়িত্ব বোধ ও দায়বদ্ধতা উপলব্ধি থাকতে হবে। এগুলো অর্জনে নিজেদের অভিজ্ঞতাকে ভাগাভাগি করে নিতে হবে। শিক্ষকের আচার-আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ চলনে-বলনে, কথা-বার্তায়, জীবন যাপনে উন্নত রুচিবোধ গড়ে তুলে শৈল্পিক নান্দনিক সৃজনশীল, শৃংখলা বোধে অভ্যস্থ হতে হবে। তাই নিম্নে লিখিত দক্ষতা অর্জনে প্রাণান্ত চেষ্টা, অনুশীলন করতে হবে।
১. আত্ম সচেতনতা (Self Awareness):
নিজের সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। আস্থা উপলব্ধি থাকতে হবে।
২. সহমর্মিতা (Empathy):
অন্যের দুঃখকষ্ট অনুধাবন করে ভাগাভাগি করে নিতে হবে।
৩. আন্ত ব্যক্তিক দক্ষতা (Inter personal Skill);
আন্তব্যক্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে অন্যকে নিজের ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
৪. বিশ্লেষণ ক্ষমতা (Critical Thinking):
সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিকল্প উপায় সমূহ নির্ধারণ এবং ঘটনার গভিরে গিয়ে প্রকৃততম্য গ্রহণে দৃষ্টি প্রদান করতে হবে।
৫. সৃজনশীল চিন্তন দক্ষতা (Creative Thinking):
কোন কাজের ধারাবাহিকতার কি কি ঘটতে পারে খুঁজে বের করে নান্দনিক শৈল্পিক বিষয় উপলব্ধি করতে হবে।
৬. সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা (Decision Making):
জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে কি করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেই দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
৭. সমস্যা সমাধানে দক্ষতা (Problem Solving):
দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন সমস্যা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সঠিক সমাধানের পথ নির্ধারণ করা।
৮. আবেগ নিয়ন্ত্রণ (Coping with emotion) :
আবেগময় দিক গুলো যেমন অনুরাগ বিরাগ মোকবিলা করার কৌশল নির্ধারণ ক্ষমতা অর্জন।
৯. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ (Coping with stress):
জীবনে বিভিন্ন চাপের মুখে ভেঙ্গেঁ না পরে স্থির থাকার কৌশল অবলম্বন ক্ষমতা।
১০. যোগাযোগ দক্ষতা (Communication Skills):

নিজের চিন্তা ভাবনা ভাল-মন্দ লাগার বিষয়গুলো গ্রহণ যোগ্য করে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারা।

উপরোক্ত বিষয়গুলোর উপর দক্ষতা অর্জনপূর্বক আইনগত বিধিমালা জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকতে হবে।
অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। সময় ও সুযোগ এখনই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে উন্নত সমৃদ্ধ মর্যাদাশীল আত্মপ্রত্যয়ী প্রজন্ম তৈরীতে অনুকুল পরিবেশ বিদ্যমান। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়ন ও উন্নত বিশ্বের কাতারে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করতে মানব সম্পদকে আরো দক্ষ সম্পদে পরিণত করতে হবে। নিতে হবে সরকারী পর্যায়ে বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপ। শ্রম বাজারের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে হবে এবং তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে আমুল পরিবর্তন আনতে হবে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি কর্মমূখী বৃত্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রম জোড়দার ও প্রসার করতে হবে। বেকার সমস্যার কারণে হতাশা, অস্থিরতা, অসামাজিকতা, নৈতিবাচক কাজে ঝুঁকে পড়ছে বর্তমান প্রজন্ম। তাই প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ঠিক রেখে কর্মমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা অর্ন্তভূক্তি করা যেতে পারে। কামার-কুমার, সুতার, নাপিত, রাজমিস্ত্রি, ফিটিং ওয়ারিং, ইলেকট্রনিস, গারমেন্টেস, কৃষিজ যন্ত্রপাতি প্রভৃতি বিষয়ের রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য কোর্স/ক্যারিকুলাম প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করতে প্রয়াসী হতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা চলে যে, শুধু মাত্র হজ্ব মৌসুমে হজ্ব যাত্রীদের মাথা মুন্ডনের জন্য অন্যান্য দেশ হতে যে সমস্ত শ্রমজীবী সৌদি আরবে নিয়োগ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। কিন্তু বাংলাদেশ সুযোগ গ্রহণকরতে পারেনা। কারণ বাংলাদেশে নাপিতের কোন প্রশিক্ষণ সার্টিফিকেট নেই। একই কারণে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলি প্রশিক্ষণের আওতায় এনে শ্রমবাজারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তি ছাড়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না। সাধারণ শিক্ষা প্রসারে ব্রত না হয়ে যে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারী (ননএমপিও) রয়েছে তাদের জীবনের আর্থিক নিরাপত্তার বিধান পূর্বক কর্মমূখী- বৃত্তি মূলক শিক্ষা ক্যারিকুলাম/কোর্স প্রবর্তন করে জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধিতে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ফলাফলে শুধু মাত্র সর্বোচ্চ গ্রেডিং পাওয়ার প্রতিযোগিতায় না থেকে প্রকৃত অর্থে মানবিক ও দেশ প্রেমে জাগ্রত হবার যত্নবান হতে মনোনিবেশ করতে হবে। পরীক্ষাপদ্ধতির মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আনতে হবে ব্যাপক রদবদল। পাবলিক (এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি) পরীক্ষায় আন্তঃ বোর্ডের অসম প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি হতে বের হয়ে আসতে হবে। তছাড়া শিক্ষকদের গুণগত মানোন্নয়নে প্রশিক্ষণ শিবিরের ব্যবস্থা জোড়দার ও প্রসার ঘটাতে হবে। ক্যাকিুলাম প্রবর্তনের পূর্বেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মতামত গ্রহণ করতে হবে। পরীক্ষামূলক ক্যারিমুলাম যত্রতত্র যখনতখন প্রবর্তনে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সর্বোপরি সব কিছুর উর্দ্ধে শিক্ষক সমাজকে এ প্রজন্মকে দক্ষ, অভিজ্ঞ, দেশপ্রেম বিশিষ্ট, যোগ্য নাগরিক বা আদর্শ চরিত্র গঠনে স্ব-উদ্যোগে দায়িত্ব নিয়ে নিরলসভাবে আত্ম নিয়োগ করতে হবে। ব্যবসায়িক মনোভাব পরিহার করে (কোচিং বাণিজ্য, প্রাইভেট) শিক্ষকের মর্যাদা শিক্ষক সমাজকেই রক্ষা করতে হবে। হারানো সম্মান পুনরুদ্ধার করতে হবে শিক্ষককেই। পরিশেষে মহান কারুনিক, অক্ষয়, অব্যয়, অনন্ত, অসীম, কৃপানিধান, আদি-অন্ত, অন্তরযামী, চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী চির সুন্দর দয়াময় প্রভুর নিকট প্রার্থনা, তুমি আমাদেরকে শক্তি দাও, সাহস দাও; আমরা যেন এ প্রজন্মকে দক্ষ অভিজ্ঞ করে উন্নত বিশ্বের কাতারে বীর বেশে, বীর দর্পে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারি।

-মোঃ মোকছেদ আলী
লেখক: অধ্যক্ষ, আক্কেলপুর মুজিবর রহমান সরকারি কলেজ, জয়পুরহাট।

আপনার মতামত লিখুন :